পোকা ও রোগ

বাড়ির আশেপাশে কোন বিষাক্ত গাছ আছে? চেনার উপায় কী?

সংক্ষেপে উত্তর

বাড়ির আশেপাশের যে গাছগুলোয় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি সেগুলো হলো ভেন্না (বীজে রিসিন — ২–৪টি বীজেই শিশুর মৃত্যু হতে পারে), ধুতরা (বীজ ও ফলে ট্রোপেন অ্যালকালয়েড) এবং আকন্দ (কষ চোখে লাগলে অন্ধত্ব)। চেনার সহজ সূত্র তিনটি — ভাঙলে সাদা কষ, কাঁটাযুক্ত বা থোকায় রঙিন ফল, আর বিনা যত্নে হুহু করে বেড়ে ওঠা।

ধুতরার কাঁটাওয়ালা ফল আর ভেন্নার পাতার কাঁদি — দুটোই বাড়ির আঙিনার চেনা ঝুঁকি।
সূচিপত্র

উঠানের কোণে, ছাদের সিঁড়ির পাশে বা সীমানার ধারে যে গাছগুলো আপনা-আপনি জন্মে যায়, তার সবগুলো নিরীহ নয়। বাংলাদেশের আঙিনায় এমন কয়েকটি বিষাক্ত গাছ খুব সাধারণভাবেই জন্মায়, যেগুলোর কোনো কোনোটির মাত্র কয়েকটি বীজ একটি শিশুর জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। মজার ব্যাপার হলো এদের প্রায় সবগুলোই একই সঙ্গে ঔষধি গাছ হিসেবেও পরিচিত — আর সেই পরিচিতিটাই বিপদটাকে আড়াল করে দেয়।

এই লেখাটি চিনে নেওয়ার জন্য, ব্যবহারের জন্য নয়। কোনো গাছের কোন অংশ কীভাবে খাওয়া বা লাগানো যায় — সে ধরনের কোনো নির্দেশনা এখানে নেই এবং থাকবেও না। উদ্দেশ্য একটাই: বাড়িতে শিশু, গবাদিপশু বা পোষা প্রাণী থাকলে আপনি যেন গাছটি দেখেই চিনতে পারেন।

আগে দেখুন — তিনটি লক্ষণে সতর্ক হয়ে যান

গাছের নাম না জানলেও এই তিনটি লক্ষণ পেলে ধরে নিন সাবধান হওয়া দরকার:

  1. ভাঙলে সাদা দুধের মতো কষ বের হয়। আকন্দ, বড় দুধিয়া, ভেন্না, বন তুলসী — সবগুলোতেই এই কষ, আর সবগুলোতেই ত্বক ও চোখের জন্য ঝুঁকি।
  2. ফল কাঁটাযুক্ত বা থোকায় থোকায় রঙিন। ধুতরার কাঁটাওয়ালা গোল ফল আর ল্যান্টেনার কালচে-বেগুনি ফল — দুটোই শিশুর হাতে যাওয়ার মতো দেখতে।
  3. গাছটি বিনা যত্নে, অনুর্বর জায়গায় হুহু করে বাড়ছে। যা কিছু কোনো পোকা খায় না, তার সাধারণত একটা কারণ থাকে।

ভেন্না — এই তালিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক গাছ

ভেন্না বা ভেরেন্ডা (Ricinus communis) চেনা যায় হাতের পাতার মতো বড় খাঁজকাটা পাতা আর কাঁটাযুক্ত ফলের কাঁদি দেখে; গাছ ২–৫ মিটার পর্যন্ত হয়, কাণ্ড প্রায়ই লালচে। এর বীজে রিসিন (ricin) আছে — পৃথিবীর অন্যতম মারাত্মক প্রাকৃতিক বিষ। মাত্র ২–৪টি বীজ একটি শিশুর মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট।

সমস্যা হলো বীজগুলো দেখতে চকচকে, দাগ-কাটা, অনেকটা মটরদানার মতো — শিশুরা কুড়িয়ে মুখে দেয়। বাড়ির আঙিনায় ভেন্না গাছ থাকলে সবচেয়ে জরুরি কাজটি হলো ফলের কাঁদি পাকার আগেই কেটে ফেলা। বাজারের পরিশোধিত ক্যাস্টর অয়েলে রিসিন থাকে না, কিন্তু বাড়িতে ভাঙানো তেল ঝুঁকিপূর্ণ।

ধুতরা — সুন্দর ভেঁপু ফুল, মারাত্মক বীজ

ধুতরা (Datura metel) ১–১.৫ মিটার ঝোপালো গাছ, বড় ভেঁপু-আকৃতির সাদা বা বেগুনি ফুল আর কাঁটাযুক্ত গোল ফল। এটি নাইট্রোজেন-সমৃদ্ধ ও মানুষের হাতে-নাড়া মাটিতে সবচেয়ে ভালো জন্মায় — অর্থাৎ ঠিক বাড়ির পাশের ফেলে রাখা জমিতে।

গাছের প্রতিটি অংশে ট্রোপেন অ্যালকালয়েড (অ্যাট্রোপিন, স্কোপোলামিন) আছে; বীজ ও ফল বিশেষভাবে বিপজ্জনক, অল্প মাত্রাতেই বিভ্রম, হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি, অচেতনতা এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। বাংলাদেশে ধুতরার অপরাধমূলক ব্যবহারের ইতিহাসও আছে। ফুল সুন্দর বলে অনেকে শখ করে রাখেন — শিশু থাকলে রাখবেন না, রাখলেও ফল ধরার আগেই ছেঁটে দিন।

আকন্দ — কষ চোখে গেলে অন্ধত্ব পর্যন্ত

আকন্দ (Calotropis gigantea) ২–৪ মিটার ধূসর-সবুজ পুরু পাতার ঝোপ, মুকুট-আকৃতির সাদা বা বেগুনি ফুল, আর ভাঙলেই প্রচুর সাদা কষ। শুকনো রাস্তার ধারে বিনা যত্নে জন্মায়। এর কষ গর্ভপাতকারী, শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী, আর চোখে লাগলে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। ডাল ভাঙার সময় হাত দিয়ে চোখ মোছার অভ্যাসটাই এখানে আসল ঝুঁকি — গাছটি ছাঁটতে হলে দস্তানা আর চোখের সুরক্ষা নিন।

এই গাছগুলোর বাংলা নাম, বৈজ্ঞানিক নাম আর বাংলাদেশে বিস্তারের বিবরণ মিলিয়ে নিতে পারেন বাংলাপিডিয়ায়।

যেগুলো প্রাণঘাতী নয়, কিন্তু ভোগাবে

গাছ চেনার প্রধান লক্ষণ যে অংশ ঝুঁকির কী হয়
বড় দুধিয়া ১৫–৫০ সেমি রোমশ, লালচে কাণ্ড; ভাঙলে সাদা আঠা কষ ত্বক ও চোখে জ্বালা; কাঁচা কষ খেলে বমি
বন তুলসী / বন মরিচ ৩০–৯০ সেমি খাড়া গুল্ম, পথের ধারে কষ / ল্যাটেক্স ত্বকে জ্বালা; ভিতরে গেলে বিষক্রিয়া
হাতিশুঁড় হাতির শুঁড়ের মতো কুণ্ডলী-পাকানো ফুলের মঞ্জরি পুরো গাছ, বিশেষত মূল পাইরোলিজিডিন অ্যালকালয়েড — দীর্ঘমেয়াদে লিভারের ক্ষতি
বিষকাটালি গিঁটওয়ালা কাণ্ড, পাতা চিবালে ঝাঁঝালো-ঝাল; পুকুরপাড়ে পাতার রস তীব্র জ্বালা; গর্ভাবস্থায় নিষেধ
ল্যান্টেনা / পুটুস থোকায় হলুদ→কমলা→লাল রং বদলানো ফুল, কালচে ফল ফল ও পাতা ল্যান্টাডিন — গবাদিপশুর লিভার ক্ষতিকর; শিশুর ফল খাওয়া বিপজ্জনক

হাতিশুঁড় নিয়ে আলাদা করে একটা কথা বলা দরকার। সামাজিক মাধ্যমে এই গাছের মূল নিয়ে “যৌনশক্তি” বিষয়ক যে দাবিগুলো ঘোরে, সেগুলো অতিরঞ্জিত — আর গাছটিতে যে পাইরোলিজিডিন অ্যালকালয়েড আছে তা নিয়মিত খেলে লিভারের ক্ষতি করে। ভিডিও দেখে গুঁড়ো বানিয়ে খাওয়ার আগে এটুকু জানা থাকা দরকার।

ল্যান্টেনা — বিষ ছাড়াও আরেকটা সমস্যা

ল্যান্টেনা সারা বছর ফুল দেয় আর প্রজাপতি টানে, তাই অনেকে শখ করে লাগান। কিন্তু এটি আগ্রাসী আগাছা — মাটিতে ছেড়ে দিলে বীজ পাখির মাধ্যমে ছড়িয়ে দেশীয় গাছকে চাপা দেয়। রাখতে চাইলে টবে বা নিয়ন্ত্রিত বেড়ায় রাখুন, আর ফল পাকার আগেই ছেঁটে দিন। গরু-ছাগল আশপাশে চরলে গাছটি না রাখাই ভালো।

যেটি বিষ ভেবে ভুল করা হয় — আর যেটি নিয়ে ভুল হয় না

পাট শাক নিয়ে দুশ্চিন্তা অকারণ নয়, তবে জায়গামতো হওয়া দরকার: পাটের পাতা রান্না করে খাওয়া নিরাপদ, কিন্তু বীজ বিষাক্ত — সেটি কেবল বপনের জন্য। বীজ আর পাতা একই ঘরে রাখলে শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন, এটুকুই।

সন্দেহ হলে গাছটার একটা ছবি তুলে রাখুন, আর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফিসে গিয়ে দেখিয়ে নিন। বিষাক্ত গাছ নিয়ে অনুমানের উপর ভরসা করার জায়গা নেই।

শিশু বা গবাদিপশু থাকলে যা করবেন

  1. উঠান, ছাদের সিঁড়ি ও সীমানার ধার একবার হেঁটে দেখুন — উপরের গাছগুলোর কোনটি আছে চিহ্নিত করুন।
  2. ভেন্না, ধুতরা আর ল্যান্টেনার ফল পাকার আগেই কেটে ফেলুন। গাছ রাখলেও ফল রাখবেন না।
  3. কষওয়ালা গাছ ছাঁটার সময় দস্তানা পরুন, আর কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চোখে হাত দেবেন না।
  4. ছাঁটা ডালপালা গবাদিপশুর নাগালে ফেলে রাখবেন না — শুকনো ল্যান্টেনা বা আকন্দ পাতা গরু-ছাগল খেয়ে ফেলে।
  5. শিশুদের একবার দেখিয়ে দিন কোন গাছের ফল ছোঁয়াও বারণ। নাম শেখানোর চেয়ে গাছটা দেখিয়ে দেওয়া বেশি কাজে দেয়।
  6. কেউ বীজ বা ফল খেয়ে ফেলেছে সন্দেহ হলে ঘরোয়া কিছু করার চেষ্টা না করে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালে যান, এবং সম্ভব হলে গাছের একটি ডাল সঙ্গে নিন — চিকিৎসকের চিনতে সুবিধা হয়।

এই গাছগুলোর কোনোটিকেই “খারাপ গাছ” বলা যায় না — অনেকগুলো কৃষিতে কাজে লাগে, কোনোটি জৈব বালাইনাশকের উপকরণ, কোনোটি আবার বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। কিন্তু যেগুলো বাড়িতে রাখবেন সেগুলো জেনেবুঝে রাখুন। কোন ঔষধি গাছ ছাদে বা টবে নিরাপদে রাখা যায় তার তালিকা আছে কোন ঔষধি গাছ টবে নিরাপদে রাখা যায়; একেবারে নতুন হলে নতুনদের প্রথম গাছ দিয়ে শুরু করুন আর ছাদে জায়গা সাজানোর ধাপগুলো দেখুন ছাদে জায়গা সাজানোর ধাপগুলো। মৌসুমভিত্তিক কৃষি পরামর্শ পাবেন কৃষি তথ্য সার্ভিসে

আরও প্রশ্ন

ঘরোয়া কিছু খাওয়ানোর বা বমি করানোর চেষ্টা না করে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান, এবং সম্ভব হলে গাছের একটি ডাল ও কয়েকটি বীজ সঙ্গে নিন যাতে চিকিৎসক গাছটি চিনতে পারেন। রিসিনের প্রভাব দেখা দিতে কয়েক ঘণ্টা লাগতে পারে, তাই লক্ষণের জন্য অপেক্ষা করবেন না।

Imran Hossain

Imran Hossain

ইমরান হোসেন — রাজশাহীর বাগানি ও বাগান বিশেষজ্ঞ। ছাদ, বারান্দা আর টবে গাছ লাগানোর প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ বাংলায় লেখেন, আর প্রতিটি পরামর্শ মিলিয়ে নেন BARI ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্দেশনার সঙ্গে।

তাঁর সব উত্তর দেখুন →

এই প্রশ্নটি কি কাজে লেগেছে?

আপনার মতামত জানান
Scroll to Top