হাত পরাগায়ন কীভাবে করব? লাউ-কুমড়ায় ফল ধরাতে
সকালে সদ্য ফোটা একটি পুরুষ ফুল ছিঁড়ে পাপড়ি সরিয়ে ফেলুন, ভেতরের পরাগসহ অংশটা স্ত্রী ফুলের আঠালো গর্ভমুণ্ডে হালকা ঘষে দিন — ব্যস। একটি পুরুষ ফুল দিয়েই ৬–৭টি স্ত্রী ফুল হয়ে যায়, আর মাচায় প্রতি ১০০ ফুলে ১০টি পুরুষ ফুল রেখে দিলে প্রায় ৯৫% স্ত্রী ফুলেই ফল ধরে।

সূচিপত্র
ছাদে বা বারান্দায় লাউ-কুমড়ার গাছ দিব্যি বাড়ছে, ফুলও ফুটছে, অথচ ছোট ফলটা একটু বড় হয়ে হলুদ হয়ে ঝরে যাচ্ছে। মাটির কাছাকাছি বাগানে মৌমাছি নিজেই কাজটা করে দেয়, কিন্তু পাঁচতলার ছাদে সেই পোকা আসেই না। তখন হাত পরাগায়ন ছাড়া উপায় নেই — কাজটা শুনতে জটিল, করতে দুই মিনিটের।
হাত পরাগায়ন আসলে কী, আর কেন লাগে
লাউ, কুমড়া, করলা, শসা, ঝিঙে, চিচিঙ্গা — এদের পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা আলাদা ফোটে। স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডে পুরুষ ফুলের পরাগ না পৌঁছালে ফল হয় না। পরাগ বয়ে নেওয়ার কাজটা প্রকৃতিতে করে মৌমাছি ও অন্যান্য পোকা।
পরাগায়ন না হলে স্ত্রী ফুলের পেছনের ছোট ফলটা সামান্য বেড়ে, হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে। গ্রামে একে অনেক সময় “নজর লাগা” বলা হয় — আসলে এটি নিছক পরাগায়নের অভাব। হাতে পরাগ পৌঁছে দিলে ফল ধরা প্রায় শতভাগ নিশ্চিত হয়ে যায়।
কোন গাছে লাগে, কোনটায় লাগে না
| গাছ | হাত পরাগায়ন | পদ্ধতি |
|---|---|---|
| লাউ, কুমড়া, করলা, শসা, ঝিঙে, চিচিঙ্গা | অবশ্যই দরকার | পুরুষ ফুলের পরাগ স্ত্রী ফুলে ঘষে দিন |
| টমেটো, মরিচ, বেগুন | দরকার নেই, তবে সাহায্যে ফলন বাড়ে | ফুলে হালকা ঝাঁকি বা কম্পন |
| ভুট্টা | দরকার হতে পারে | উপরের ঝালর নেড়ে পরাগ ঝরিয়ে দিন |
| শিম, বরবটি, মটর | লাগে না | নিজেই পরাগায়িত হয় |
| শাক, মূলা, গাজর, কপি | লাগে না | পাতা বা মূল খাওয়া হয়, ফল নয় |
পুরুষ আর স্ত্রী ফুল চেনার উপায়
এটাই পুরো কাজের ভিত্তি, আর নিয়মটা মাত্র একটা — ফুলের পেছনে ছোট একটা ফল আছে কি না দেখুন।
- স্ত্রী ফুল: পাপড়ির ঠিক পেছনে ছোট লাউ, কুমড়া বা শসার আকৃতি স্পষ্ট থাকে। বোঁটা ছোট ও মোটা। ভেতরে খাটো, মোটা ও আঠালো গর্ভমুণ্ড, পরাগ নেই।
- পুরুষ ফুল: লম্বা, সরু, খালি বোঁটার মাথায় ফোটে। পেছনে কোনো ফল নেই। ভেতরে গুঁড়ো পরাগে ভরা পরাগধানী।
মনে রাখবেন, গাছের প্রথম দিকের প্রায় সব ফুলই পুরুষ ফুল হয় — এটি স্বাভাবিক, রোগ নয়। স্ত্রী ফুলই যদি না আসে, সমস্যাটা পরাগায়নের নয়, শাখা ব্যবস্থাপনার; সেটির সমাধান আছে গাছে স্ত্রী ফুলই না এলে কী করবেন।
ধাপে ধাপে হাত পরাগায়ন
- সময়: সকাল — ফুল সদ্য ফোটা অবস্থায়। বেলা বাড়লে পরাগের কার্যক্ষমতা কমে যায় আর ফুল বন্ধ হতে শুরু করে।
- একটি সদ্য ফোটা পুরুষ ফুল বোঁটাসহ ছিঁড়ে নিন।
- পাপড়িগুলো সাবধানে ছিঁড়ে ফেলে দিন, যাতে ভেতরের পরাগভরা অংশটা খোলা বেরিয়ে থাকে।
- সেই অংশটা স্ত্রী ফুলের ভেতরের আঠালো গর্ভমুণ্ডে হালকা করে ঘষে দিন। চারপাশ ঘুরিয়ে ছোঁয়ালে পরাগ সমানভাবে লাগে।
- একই পুরুষ ফুল দিয়ে পরের স্ত্রী ফুলগুলোতেও একইভাবে করুন।
পুরুষ ফুল ছিঁড়তে না চাইলে নরম ব্রাশ বা কটন-বাড ব্যবহার করা যায় — পুরুষ ফুল থেকে পরাগ তুলে স্ত্রী ফুলে ছুঁইয়ে দিন। তবে এক-দুই ছোঁয়ায় পরাগ কম পড়লে ফল বাঁকা বা খাটো হয়, তাই কয়েকটি পুরুষ ফুল থেকে পরাগ নিয়ে ভালো করে লাগান।
একটা পুরুষ ফুল কতদূর যায়
একটি পুরুষ ফুলের পরাগধানী দিয়ে ৬ থেকে ৭টি স্ত্রী ফুল পরাগায়ন করা যায়। মাচায় প্রতি ১০০টি ফুলের মধ্যে ১০টির মতো পুরুষ ফুল রেখে দিলেই যথেষ্ট — এভাবে করলে প্রায় ৯৫% স্ত্রী ফুলে ফল ধরে। বাড়তি পুরুষ ফুল রেখে দিলে গাছের শক্তি অকারণে খরচ হয়। লতাজাতীয় সবজির জাতভিত্তিক ফলনের হিসাব দেখতে পারেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর সাইটে।
টমেটো, মরিচ ও বেগুনে আলাদা কৌশল
এদের ফুলে পুরুষ ও স্ত্রী অংশ একসঙ্গেই থাকে, তাই আলাদা পুরুষ ফুল লাগে না। কিন্তু বদ্ধ বারান্দায় বাতাস ও পোকার নাড়া না পেলে পরাগ ঝরে না। ফুল ফোটার সময় দিনে একবার ডালটা হালকা ঝাঁকি দিন, বা ব্যাটারিচালিত টুথব্রাশের পেছনটা ফুলের বোঁটায় কয়েক সেকেন্ড ছুঁইয়ে কাঁপুনি দিন। টমেটোর ফুল ঝরে যাওয়ার পেছনে আরও কয়েকটি কারণ থাকে, সেগুলো আছে টমেটোয় ফুল ঝরার বাকি কারণগুলো।
বর্ষায় কেন কাজটা আরও জরুরি
বর্ষার আর্দ্রতায় লতাজাতীয় গাছে স্ত্রী ফুলের সংখ্যা এমনিতেই কমে যায়, আর বৃষ্টির দিনে মৌমাছি-প্রজাপতি প্রায় বেরোয়ই না। ভেজা পরাগ আঠা ধরে যায় বলে প্রাকৃতিক পরাগায়ন আরও কমে। তাই খরিফ-২ মৌসুমে যে ক’টা স্ত্রী ফুল পাবেন, প্রতিটিতে হাতে পরাগ দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। বৃষ্টির ফাঁকে সকালের শুকনো সময়টা বেছে নিন। খরিফ-২ মৌসুমের ফসল ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা কৃষি তথ্য সার্ভিসে বিস্তারিত আছে।
দীর্ঘমেয়াদে ছাদে গাঁদা, জিনিয়া, সূর্যমুখী বা ধনেফুল লাগিয়ে রাখলে পরাগবাহক পোকা আসতে শুরু করে — তখন হাতের কাজ অনেক কমে যায়। ছাদে কোথায় কী বসাবেন তার পরিকল্পনা আছে ছাদে কোথায় কী বসাবেন।
দুটো ভুল ধারণা
এক: “ঝাল মরিচের পাশে মিষ্টি ক্যাপসিকাম লাগালে ক্যাপসিকামও ঝাল হয়ে যাবে” — হয় না। পরাগায়ন এই মৌসুমের ফলের স্বাদ বদলায় না, প্রভাব পড়ে শুধু ওই ফল থেকে রাখা বীজে, অর্থাৎ পরের প্রজন্মে। শসা ও মেলনের ক্ষেত্রেও একই কথা।
দুই: “হরমোন স্প্রে করলে পরাগায়ন লাগে না” — লাগে। হরমোন সাময়িকভাবে ফল ধরাতে পারে, কিন্তু বীজহীন ও বিকৃত ফল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ঘরোয়া বাগানে হাতে পরাগ দেওয়াই সস্তা, নিরাপদ ও নিশ্চিত।
এক নজরে করণীয়
প্রতিদিন সকালে মাচাটা একবার দেখুন। পেছনে ছোট ফলওয়ালা ফুল পেলেই বুঝবেন স্ত্রী ফুল ফুটেছে — তখনই একটা পুরুষ ফুল ছিঁড়ে পাপড়ি সরিয়ে পরাগ ঘষে দিন। একটা পুরুষ ফুলেই ৬–৭টা হয়ে যাবে। টমেটো-মরিচে শুধু ঝাঁকি। কাজটা রোজ দুই মিনিটের, আর ফলের হিসাবে পার্থক্যটা মৌসুম শেষে নিজেই দেখতে পাবেন। ছাদে গাঁদা-জিনিয়া বসিয়ে রাখলে বছর দুয়েকের মধ্যে মৌমাছি ফিরতে শুরু করে, তখন এই দুই মিনিটও আর লাগে না। এলাকাভিত্তিক পরামর্শের জন্য উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফিস আছেই।
আরও প্রশ্ন
সকালে, ফুল সদ্য ফোটার পরপরই। বেলা বাড়লে পরাগের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং অনেক ফুল বন্ধ হতে শুরু করে। বৃষ্টির দিনে ফাঁক বুঝে শুকনো সময়টা বেছে নিন।
দুই-তিন দিনের মধ্যেই বোঝা যায়। পরাগায়ন হলে ফুলের পেছনের ছোট ফলটা মোটা হয়ে বাড়তে শুরু করে। না হলে সেটি হলুদ হয়ে শুকিয়ে ঝরে পড়ে।
একই জাতের পাশের গাছ থেকে পুরুষ ফুল এনে ব্যবহার করা যায়, লাউয়ে লাউয়ের, কুমড়ায় কুমড়ার। ফুল ছেঁড়ার পর দ্রুত কাজ সারুন — শুকিয়ে গেলে পরাগ কাজ করে না।
যায়, তবে পরাগ কম পড়লে ফল বাঁকা বা খাটো হতে পারে। ব্রাশ ব্যবহার করলে কয়েকটি পুরুষ ফুল থেকে পরাগ নিয়ে গর্ভমুণ্ডে ভালো করে ছোঁয়ান।
এই প্রশ্নটি কি কাজে লেগেছে?
কোম্পানি বা বিক্রেতা? পণ্য রিভিউ করাতে পাঠান →


