শাকসবজি

টবে কলমি শাক চাষ করব কীভাবে? বর্ষায় পানি জমলেও চলে

সংক্ষেপে উত্তর

কলমি আধা-জলজ গাছ, তাই বর্ষায় যখন অন্য শাক গোড়া পচে মরে যায় তখনও এটি দিব্যি বাড়ে। ২ ভাগ দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটির সঙ্গে ১ ভাগ পচা গোবর মিশিয়ে টবে ৫–৬ ইঞ্চি দূরত্বে ১০–১২টি বীজ বুনুন — ৩–৪ দিনেই গজায়, আর ৩০ দিনে গোড়া থেকে ৫–৭ সেন্টিমিটার উপরে কেটে নিলে বারবার গজাতে থাকে।

গোড়া থেকে ৫–৭ সেন্টিমিটার উপরে কাটলে কলমি বারবার নতুন ডগা ছাড়ে।
সূচিপত্র

বর্ষা এলেই ছাদের বেশিরভাগ শাকের একই দশা — গোড়া নরম, পাতা হলুদ, তারপর গাছ শেষ। এই মৌসুমে যে গুটিকয়েক শাক সত্যিই ভরসা করা যায়, কলমি তার সবার আগে। টবে কলমি শাক চাষ করলে টানা বৃষ্টির মধ্যেও ফসল পাওয়া যায়, বীজ গজায় তিন-চার দিনে, আর একবার লাগালে বারবার কেটে খাওয়া যায়। নিচে বীজ বোনা থেকে কাটাই পর্যন্ত পুরো নিয়ম।

বর্ষায় কলমি কেন টিকে যায়

কলমি (Ipomoea aquatica) আধা-জলজ গাছ। বাংলাদেশের খাল-বিল-ডোবায় এটি পানিতে ভেসেই বেড়ে ওঠে। ডাঁটা ফাঁপা, ভেতরে বাতাসের কুঠুরি — তাই ভেজা মাটিতেও শিকড় শ্বাস নিতে পারে। যে অবস্থায় লালশাক বা পালং শাকের গোড়া পচে যায়, কলমি সেখানেই দিব্যি বাড়ে।

তবে একটা পার্থক্য মনে রাখুন — জলাশয়ের চলমান পানি আর টবের বদ্ধ পানি এক জিনিস নয়। টবে দিনের পর দিন কাদা-পানি জমে থাকলে অক্সিজেন ফুরিয়ে যায় আর কলমিরও গোড়া নষ্ট হতে পারে। কলমি ভেজা মাটি সহ্য করে, কিন্তু অতিরিক্ত পানি ঢালার দরকার নেই। টবের নিষ্কাশন কীভাবে ঠিক রাখবেন তা আছে টবের নিচে পানি জমছে কি না বুঝবেন যেভাবে

কোন টব আর কেমন মাটি

কলমির শিকড় ছড়ায় বেশি, গভীরে যায় কম। তাই চওড়া কিন্তু কম গভীর টব বা লম্বা প্লান্টারই সবচেয়ে ভালো — একই জায়গায় অনেক বেশি গাছ ধরে। ন্যূনতম ১৫ সেন্টিমিটার গভীরতা হলেই চলে।

মাটির অনুপাত সহজ: ২ ভাগ দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি + ১ ভাগ পচা গোবর। কলমি প্রায় সব ধরনের মাটিতেই হয়, তবে দোআঁশে ফলন সবচেয়ে ভালো। মিশ্রণটা ঝুরঝুরে করার নিয়ম আছে দোআঁশ আর গোবরের অনুপাত

কখন বুনবেন

কলমি প্রায় সারা বছরই চাষ করা যায়, তবে বীজ বোনার উপযুক্ত সময় চৈত্র থেকে শ্রাবণ, অর্থাৎ মার্চ থেকে অগাস্ট। গরম ও আর্দ্রতা যত বেশি, বৃদ্ধি তত দ্রুত। শীতের কড়া ঠান্ডায় বৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়, তখন ফলন কমে আসে। কোন শাক কোন মৌসুমে বসানো উচিত তার তালিকা কৃষি তথ্য সার্ভিসে দেওয়া আছে।

বীজ বোনার নিয়ম

  1. টবের মাটি ভিজিয়ে সমান করে নিন।
  2. একটি মাঝারি টবে ৫–৬ ইঞ্চি দূরত্বে ১০–১২টি বীজ বুনুন। জমিতে করলে সারি থেকে সারি ৩০ সেন্টিমিটার, বীজ থেকে বীজ ১৫ সেন্টিমিটার।
  3. বীজ খুব গভীরে নয় — আধা ইঞ্চির মতো চাপা দিলেই যথেষ্ট।
  4. ৩–৪ দিনেই চারা গজায়। এত দ্রুত গজায় বলে নতুন বাগানিদের জন্য এটি চমৎকার শুরু।
  5. চারা ঘন হলে দুর্বলগুলো তুলে ফাঁক করে দিন — ঘন থাকলে ডাঁটা সরু হয়।

ডাল থেকেও সহজে হয়

বীজ না পেলে বাজার থেকে কেনা তাজা কলমি শাকের ডাঁটাই কাজে লাগে। ৬–৮ ইঞ্চি ডাঁটা নিয়ে নিচের পাতা ছাড়িয়ে ভেজা মাটিতে তেরছা করে পুঁতে দিন, বা কয়েক দিন পানিতে রেখে শিকড় গজিয়ে নিন। গিঁট থেকে দ্রুত শিকড় বেরোয়। এই পদ্ধতিতে বীজের চেয়ে অন্তত এক সপ্তাহ আগে ফসল পাওয়া যায়।

পানি, রোদ ও সার

রোদ লাগবে পূর্ণ থেকে আধো — দিনে ৪–৫ ঘণ্টা রোদ পেলেই ভালো ফলন হয়, তাই আধা-ছায়ার বারান্দাতেও চলে। কলমি খরা একদম সহ্য করে না, মাটি শুকিয়ে গেলে ডাঁটা শক্ত ও আঁশযুক্ত হয়ে যায়।

সার সাধারণ — মাসে একবার ১০০–১৫০ গ্রাম ভার্মিকম্পোস্ট বা ২০০–৩০০ গ্রাম পচা গোবর গোড়ার চারপাশে মিশিয়ে দিন। কলমি পাতার গাছ, তাই নাইট্রোজেন-প্রধান জৈব সারেই ভালো সাড়া দেয়। প্রতিবার কাটাইয়ের পর একটু তরল সার দিলে নতুন ডগা দ্রুত আসে।

কাটাই — একবার বুনে বারবার

বপনের ৩০ দিনের মাথায় গাছ ১২–১৫ ইঞ্চি লম্বা হলে প্রথম কাটাই। গাছ উপড়াবেন না — গোড়া থেকে ৫–৭ সেন্টিমিটার উপরে কেটে নিন। বাকি গোড়া থেকেই নতুন ডগা বেরোবে।

এরপর প্রতি ১৫–২০ দিন পরপর কাটতে থাকুন। এভাবে একটি টব থেকে টানা কয়েক মাস শাক মেলে। ফুল আসতে দেখলে ডগা কেটে দিন — ফুলে গেলে ডাঁটা শক্ত হয়ে যায়।

যেগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন আসে

লক্ষণ পেছনের কারণ করণীয়
পাতায় ছোট ছোট ছিদ্র পাতার বিট্ল বা কচ্ছপ পোকা হাতে বেছে ফেলুন, সাবান-পানি স্প্রে
পাতা কেটে খেয়ে ফেলছে বিছা পোকা সন্ধ্যায় দেখে তুলে ফেলুন, নিম তেল স্প্রে
ডাঁটা সরু ও লম্বা গাছ ঘন, রোদ কম পাতলা করুন, বেশি আলোয় সরান
ডাঁটা শক্ত ও আঁশযুক্ত দেরিতে কাটা বা পানির ঘাটতি ৩০ দিনের মধ্যে কাটুন, মাটি ভেজা রাখুন
গোড়া নরম, পচা গন্ধ টবে বদ্ধ কাদা-পানি জমেছে ছিদ্র খুলে দিন, কয়েক দিন পানি বন্ধ

গোড়া পচা ধরলে গাছ বাঁচানোর ধাপগুলো আছে গোড়া পচা ধরলে গাছ বাঁচানোর ধাপ

জাত ও বীজ

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত ‘গিমা কলমি-১’ জাতটির ফলন ভালো এবং টবেও ভালো ফল দেয়। সাধারণ দেশী কলমির বীজও ব্যবহার করা যায়। জমিতে চাষ করলে প্রতি শতাংশে ৪০–৫০ গ্রাম বীজ লাগে, ফলন হয় ১৪০–১৬০ কেজি — অর্থাৎ ঘরোয়া টবে অল্প বীজেই কাজ চলে যায়।

এক নজরে করণীয়

  1. চওড়া, কম গভীর টব নিন — ২ ভাগ দোআঁশ + ১ ভাগ পচা গোবর।
  2. ৫–৬ ইঞ্চি দূরত্বে ১০–১২টি বীজ, আধা ইঞ্চি গভীরে। ৩–৪ দিনে গজাবে।
  3. বীজ না থাকলে বাজারের তাজা ডাঁটা কেটে পুঁতে দিন।
  4. মাটি সবসময় ভেজা রাখুন, তবে টবে বদ্ধ পানি জমতে দেবেন না।
  5. ৩০ দিনে গোড়া থেকে ৫–৭ সেন্টিমিটার উপরে কাটুন, তারপর ১৫–২০ দিন পরপর।
  6. প্রতি কাটাইয়ের পর একটু জৈব সার দিন।

বর্ষায় কলমির পাশাপাশি পুঁইশাকও একই রকম নির্ভরযোগ্য — দুটো টব পাশাপাশি রাখলে সারা বর্ষা শাকের অভাব হয় না। তুলনা দেখে নিন বর্ষার আরেক ভরসা পুঁইশাকের লেখায়। ‘গিমা কলমি-১’ সহ অনুমোদিত জাতগুলোর বিবরণ পাবেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর সাইটে, আর স্থানীয় বীজ কোথায় মিলবে তা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফিস বলে দিতে পারবে।

আরও প্রশ্ন

প্রথম কাটাই ৩০ দিনে, এরপর প্রতি ১৫–২০ দিন পরপর। গোড়া থেকে ৫–৭ সেন্টিমিটার উপরে কাটলে এবং প্রতিবার একটু জৈব সার দিলে একটি টব থেকে টানা কয়েক মাস শাক পাওয়া যায়।

Imran Hossain

Imran Hossain

ইমরান হোসেন — রাজশাহীর বাগানি ও বাগান বিশেষজ্ঞ। ছাদ, বারান্দা আর টবে গাছ লাগানোর প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ বাংলায় লেখেন, আর প্রতিটি পরামর্শ মিলিয়ে নেন BARI ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্দেশনার সঙ্গে।

তাঁর সব উত্তর দেখুন →

এই প্রশ্নটি কি কাজে লেগেছে?

আপনার মতামত জানান
Scroll to Top