মাটি ও সার

টবের মাটি তৈরি করব কীভাবে? ঝুরঝুরে মিশ্রণের নিয়ম

সংক্ষেপে উত্তর

শুধু বাগানের মাটি টবে ভরলে কিছুদিনেই তা ইটের মতো শক্ত হয়ে যায় আর শিকড় শ্বাস নিতে পারে না। পরীক্ষিত অনুপাত হলো ৪ ভাগ দোআঁশ মাটি, ২ ভাগ ভার্মিকম্পোস্ট বা পচা গোবর, ২ ভাগ কোকোপিট এবং ১ ভাগ বালু বা পোড়া তুষ।

টবের মাটির মিশ্রণ — মাটি, কম্পোস্ট, কোকোপিট আর বালু মিশিয়ে ঝুরঝুরে করা।
সূচিপত্র

টবের গাছ ভালো না হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ সার নয়, পানি নয় — মাটি। মাঠের মাটি মাঠে ভালো, কিন্তু টবে ভরলে কিছুদিনের মধ্যেই সেটা চেপে বসে শক্ত হয়ে যায়। টবের মাটি তৈরি করার কাজটা তাই আলাদা, আর একবার শিখে নিলে সারা জীবন কাজে লাগে।

টবের মাটিকে তিনটে কাজ করতে হয়

খোলা জমিতে মাটির গভীরতা অসীম, বৃষ্টির পানি নিচে নেমে যায়, কেঁচো-পোকা মাটি আলগা রাখে। টবে এসব কিছুই নেই। তাই মিশ্রণকে একসঙ্গে তিনটে কাজ করতে হয়:

  1. ধরে রাখা — গাছ যাতে সোজা দাঁড়ায়, শিকড় আশ্রয় পায়।
  2. পানি ছাড়া — বাড়তি পানি দ্রুত বেরিয়ে যাবে, নইলে শিকড় পচে।
  3. বাতাস রাখা — শিকড়ও শ্বাস নেয়। মাটি চেপে গেলে শিকড় দম বন্ধ হয়ে মরে।

শুধু দোআঁশ মাটি প্রথম কাজটা করে, বাকি দুটো পারে না। তাই মেশাতে হয়।

মূল অনুপাত

ফল-সবজির টবের জন্য এই মিশ্রণ প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাজ করে:

৪ ভাগ দোআঁশ মাটি · ২ ভাগ ভার্মিকম্পোস্ট বা পচা গোবর · ২ ভাগ কোকোপিট · ১ ভাগ বালু বা পোড়া ধানের তুষ

উপকরণ ভাগ কাজ
দোআঁশ মাটি ভিত্তি, গাছ ধরে রাখে
ভার্মিকম্পোস্ট / পচা গোবর খাবার ও উপকারী জীবাণু
কোকোপিট হালকা রাখে, পানি ধরে রাখে
বালু / পোড়া তুষ পানি বেরোনোর পথ, বাতাস

শাক ও ধনেপাতার মতো অল্প গভীর গাছের জন্য কোকোপিট এক ভাগ বাড়িয়ে দিতে পারেন — মাটি আরও হালকা হবে। উল্টোদিকে লেবু বা পেয়ারার মতো বড় গাছে মাটির ভাগ একটু বাড়ান, যাতে গাছ শক্ত করে দাঁড়ায়।

কোকোপিট ব্যবহারের আগে যা জানা দরকার

কোকোপিট নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়া। এটা মাটি হালকা রাখে আর পানি ধরে রাখে — টবের জন্য দারুণ। কিন্তু শুকনো কোকোপিটে প্রায়ই লবণ থাকে, আর সেই লবণ কচি শিকড় পুড়িয়ে দেয়।

ব্যবহারের আগে একবার ধুয়ে নিন: বালতিতে পানি দিয়ে কোকোপিট ভিজিয়ে ফুলতে দিন, তারপর চেপে পানি ফেলে দিন। দুইবার করলে ভালো। এরপর মিশ্রণে দিন।

কোন সার কখন কত

মিশ্রণ তৈরির সময় যে সার দিলেন তা এক-দুই মাসেই শেষ হয়ে যায়। এরপর নিয়ম করে দিতে হবে। ৩০ সেন্টিমিটার (১২ ইঞ্চি) টবের হিসাব:

সার পরিমাণ কত দিনে কী কাজ
পচা গোবর সার ২০০–৩০০ গ্রাম ৩০ দিন সাধারণ খাবার
ভার্মিকম্পোস্ট ১০০–১৫০ গ্রাম ৩০ দিন খাবার ও জীবাণু
নিম খৈল ২০–৩০ গ্রাম মৌসুমে একবার সার ও পোকা তাড়ায়
সরিষার খৈল-ভেজা পানি ১০০ গ্রাম / ১ লিটার, ৪৮ ঘণ্টা ভেজানো ১৫ দিন দ্রুত কাজের তরল সার
কাঠের ছাই ১ চা-চামচ ৩০ দিন পটাশ, ফুল-ফল ধরায়
হাড়ের গুঁড়া ১ টেবিল-চামচ মৌসুমে একবার ফসফরাস, শিকড় ও ফুল

তিনটে নিয়ম মনে রাখুন। এক, সার দিন সব সময় ভেজা মাটিতে — শুকনো মাটিতে দিলে শিকড় পুড়ে যায়। দুই, গোড়ার গা ঘেঁষে নয়, দুই ইঞ্চি দূরে ছড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিন। তিন, কাঁচা গোবর কখনো দেবেন না — পচার সময় তাপ ছাড়ে আর শিকড় মেরে ফেলে; ভালোভাবে পচা, ঝুরঝুরে ও গন্ধহীন গোবরই ব্যবহার করুন।

পুরনো মাটি ফেলে দেবেন না

এক মৌসুম পর টবের মাটি ক্লান্ত হয়ে যায় — শক্ত, পুষ্টিহীন। কিন্তু ফেলে দেওয়ার দরকার নেই। যা করবেন:

  1. মাটি টব থেকে বের করে চাদরে ছড়িয়ে দুই-তিন দিন কড়া রোদে শুকান। এতে পোকার ডিম ও ছত্রাক মরে।
  2. পুরনো শিকড়, পাথর ও আধপচা পাতা বেছে ফেলুন।
  3. প্রতি ৪ ভাগ পুরনো মাটিতে ২ ভাগ নতুন ভার্মিকম্পোস্ট বা পচা গোবর১ ভাগ কোকোপিট মিশিয়ে নিন।
  4. এক মুঠো কাঠের ছাই মিশিয়ে দিন, তারপর ৭ দিন ছায়ায় ঢেকে রেখে ব্যবহার করুন।

এভাবে একই মাটি বছরের পর বছর চলতে পারে, খরচও অনেক কমে।

মাটি ঠিক আছে কি না বুঝবেন কীভাবে

দুটো সহজ পরীক্ষা। এক, এক মুঠো ভেজা মাটি হাতে চেপে ধরুন — ছেড়ে দিলে যদি আলগা হয়ে ভেঙে যায়, ঠিক আছে; যদি কাদার মতো দলা হয়ে থাকে, বালু বা তুষ বাড়াতে হবে। দুই, টবে পানি ঢালুন — পানি যদি ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে নিচ দিয়ে বেরিয়ে যায়, নিষ্কাশন ভালো; উপরে দাঁড়িয়ে থাকলে মাটি চেপে গেছে।

মাটি ও সার নিয়ে আরও প্রশ্ন-উত্তর এই বিভাগে। ছাদে শুরু করার পুরো তালিকা এখানে, আর পাতা হলুদ হওয়ার কারণ এখানে। জৈব সার ও মাটি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি তথ্য দেখুন BARIAIS-এ।

রান্নাঘরের বর্জ্য দিয়ে নিজেই সার

প্রতি মাসে সার কেনার দরকার নেই — রান্নাঘরের খোসাই যথেষ্ট। সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি:

  1. একটা বালতি বা পুরনো ড্রামের তলায় ও গায়ে কয়েকটা ছিদ্র করুন।
  2. নিচে ২ ইঞ্চি শুকনো পাতা বা ছেঁড়া কাগজের আস্তরণ দিন।
  3. এর উপর সবজির খোসা, চা-পাতা, ডিমের খোসা দিন। মাছ-মাংস, তেল, দুধ বা রান্না করা খাবার দেবেন না — গন্ধ হবে আর পোকা আসবে।
  4. প্রতি স্তরের পর এক মুঠো শুকনো পাতা বা মাটি ছড়িয়ে দিন। ভেজা আর শুকনো জিনিসের ভাগ প্রায় সমান রাখুন।
  5. সপ্তাহে একবার লাঠি দিয়ে নেড়ে দিন যাতে বাতাস ঢোকে।

৬০–৯০ দিনে কালচে, ঝুরঝুরে, মাটির গন্ধওয়ালা কম্পোস্ট তৈরি হবে। টক গন্ধ এলে বুঝবেন ভেজা জিনিস বেশি পড়েছে — শুকনো পাতা মিশিয়ে নেড়ে দিন। বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান এই একটাই।

মাটি বেশি অম্ল বা ক্ষারীয় হলে

বাংলাদেশের বেশিরভাগ দোআঁশ মাটি টবের সবজির জন্য ঠিকই থাকে, তাই নতুন অবস্থায় এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার দরকার নেই। তবু দুটো লক্ষণ চেনা ভালো।

যদি নিয়ম করে সার দেওয়ার পরেও পাতা ক্রমাগত ফ্যাকাশে বা শিরা-সবুজ-মাঝখান-হলুদ হয়ে থাকে, মাটি সম্ভবত বেশি ক্ষারীয় — গাছ আয়রন তুলতে পারছে না। এক্ষেত্রে ভার্মিকম্পোস্ট ও পাতা-পচা সার বাড়ান, কাঠের ছাই কমিয়ে দিন (ছাই ক্ষারীয়)।

উল্টোদিকে মাটি খুব অম্ল হলে গাছের বাড়ন্ত থেমে যায়। তখন অল্প কাঠের ছাই বা এক চিমটি চুন মিশিয়ে দিলে ভারসাম্য ফেরে। ছাই দিন মাসে এক চা-চামচের বেশি নয় — অতিরিক্ত ছাই উল্টো সমস্যা তৈরি করে।

সন্দেহ থাকলে সবচেয়ে সহজ সমাধান হলো মাটি বদলে নতুন মিশ্রণ করা। এক টব মাটির দাম নষ্ট হওয়া গাছের চেয়ে অনেক কম।

টব ভরার সময় ছোট ভুলগুলো

  • টব কানায় কানায় ভরবেন না। উপরে এক ইঞ্চি ফাঁকা রাখুন, নইলে পানি দিলেই মাটিসহ উপচে পড়বে।
  • তলায় ইটের টুকরো বা কাঁকর দিন — এক ইঞ্চির একটা স্তর। এতে ছিদ্র মাটিতে বন্ধ হয় না, পানি সহজে বেরোয়।
  • মাটি চেপে চেপে ভরবেন না। হাতে হালকা করে বসিয়ে দিন। চেপে ভরলে যে বাতাসের জায়গাটা রাখার জন্য এত কষ্ট করলেন, সেটাই নষ্ট হয়ে যায়।
  • মিশ্রণ তৈরির পর একবার ভিজিয়ে এক দিন রেখে দিন, তারপর গাছ বসান। শুকনো কোকোপিট মিশ্রণে পানি সমান ঢোকে না।
  • নতুন মিশ্রণে সঙ্গে সঙ্গে রাসায়নিক সার দেবেন না। কম্পোস্টেই যথেষ্ট খাবার আছে; প্রথম ২০–২৫ দিন বাড়তি কিছু লাগে না।

মাটি একবার ঠিকমতো বানিয়ে ফেললে গাছের অর্ধেক সমস্যা এমনিতেই চলে যায়। টবের বাগানে এটাই সবচেয়ে লাভজনক পরিশ্রম।

আরও প্রশ্ন

৪ ভাগ দোআঁশ মাটি, ২ ভাগ ভার্মিকম্পোস্ট বা পচা গোবর, ২ ভাগ কোকোপিট এবং ১ ভাগ বালু বা পোড়া ধানের তুষ। শাকের টবে কোকোপিট এক ভাগ বাড়ানো যায়।

Imran Hossain

Imran Hossain

ইমরান হোসেন — রাজশাহীর বাগানি ও বাগান বিশেষজ্ঞ। ছাদ, বারান্দা আর টবে গাছ লাগানোর প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ বাংলায় লেখেন, আর প্রতিটি পরামর্শ মিলিয়ে নেন BARI ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্দেশনার সঙ্গে।

তাঁর সব উত্তর দেখুন →

এই প্রশ্নটি কি কাজে লেগেছে?

আপনার মতামত জানান
Scroll to Top