টবে ও ছাদে

টবের পানি নিষ্কাশন ঠিক আছে কি? বর্ষায় যা দেখবেন

সংক্ষেপে উত্তর

টবের মাটিতে এক লিটার পানি ঢালুন — ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে মিলিয়ে গিয়ে এক-দুই মিনিটে নিচের ছিদ্র দিয়ে পড়তে শুরু করলে নিষ্কাশন ঠিক আছে। পানি ওপরে দাঁড়িয়ে থাকলে ছিদ্র খুলুন, ট্রে সরান, টব ইটের ওপর তুলুন এবং মাটিতে কোকোপিট ও বালু মিশিয়ে ঝরঝরে করুন।

ইটের ওপর তোলা টব — নিচ দিয়ে পানি অবাধে বেরোলেই বুঝবেন নিষ্কাশন ঠিক আছে।
সূচিপত্র

বর্ষা শুরু হলে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটা আসে — টবের পানি নিষ্কাশন ঠিক আছে কি না বুঝব কীভাবে? গাছ মরে যাওয়ার পর বোঝা গেলে তো দেরি হয়ে গেল। ভালো খবর হলো, তিন মিনিটের একটা সহজ পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে যায়, আর বর্ষায় কয়েকটা লক্ষণ দেখলেই আগেভাগে বোঝা যায় কোন টবটা ঝুঁকিতে আছে। নিচে দুটোই দেওয়া হলো।

টবের পানি নিষ্কাশন পরীক্ষা — তিন মিনিটে

শুকনো একটা দিন বেছে নিন। টবের মাটিতে ধীরে ধীরে এক লিটার পানি ঢালুন আর ঘড়ি দেখুন।

  • ভালো: পানি মাটির ওপর দাঁড়ায় না, ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে মিলিয়ে যায় এবং এক-দুই মিনিটের মধ্যেই নিচের ছিদ্র দিয়ে পানি পড়তে শুরু করে।
  • মোটামুটি: পানি কিছুক্ষণ ওপরে দাঁড়িয়ে থাকে, নিচ দিয়ে পড়ে ধীরে। বর্ষার আগে মাটি আলগা করা দরকার।
  • খারাপ: পানি ওপরে জমে থাকে, নিচ দিয়ে প্রায় কিছুই পড়ে না। এই টবের গাছ বর্ষায় বাঁচবে না — এখনই ব্যবস্থা নিন।

নিচ দিয়ে পানি পড়ছে অথচ ওপরেও জমে আছে — এমন হলে বুঝবেন মাটি শক্ত হয়ে গেছে আর পানি ধারে ধারে গড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, মাটির ভেতর দিয়ে নয়।

বর্ষায় যেসব লক্ষণ দেখবেন

পরীক্ষা না করেও এই লক্ষণগুলো নিজেই বলে দেয় কোথায় সমস্যা।

যা দেখছেন যা বোঝাচ্ছে করণীয়
বৃষ্টির পরেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি ওপরে দাঁড়িয়ে ছিদ্র বন্ধ বা মাটি জমাট ছিদ্র খুলুন, মাটির ওপরের স্তর আলগা করুন
মাটির ওপর সবুজ শ্যাওলা বা সাদাটে আস্তরণ ওপরের স্তর কখনোই শুকাচ্ছে না ওপরের ২ সেমি মাটি তুলে ফেলে নতুন মিশ্রণ দিন
টবের চারপাশে ছোট কালো মাছি উড়ছে মাটি সবসময় ভেজা — ছত্রাক মশা পানি দেওয়া কমান, মাটি শুকাতে দিন
টব তুললে অস্বাভাবিক ভারী লাগছে মাটি পানিতে পরিপূর্ণ কাত করে পানি ঝরান, ইটের ওপর তুলুন
মাটি থেকে টক বা পচা গন্ধ বাতাসশূন্য মাটি, পচন শুরু গাছ তুলে শিকড় দেখুন — গোড়া পচা রোগ হয়ে থাকতে পারে

ছিদ্র — কয়টা, কত বড়, কোথায়

বাজারের প্লাস্টিকের টবে সাধারণত ছিদ্র থাকে ছোট আর কম। বর্ষার জন্য সেটা যথেষ্ট নয়। একটি ১০–১২ ইঞ্চি টবে ৪ থেকে ৬টি ছিদ্র রাখুন, প্রতিটি অন্তত ১ সেন্টিমিটার চওড়া। গরম শিক বা ড্রিল দিয়ে নিজেই বাড়িয়ে নেওয়া যায়।

ছিদ্র শুধু একেবারে মাঝখানে না রেখে তলার কিনারা ঘেঁষেও কয়েকটা রাখুন। টব যখন সমতল মেঝেতে বসে থাকে, মাঝের ছিদ্রটা মেঝের সঙ্গে চেপে বন্ধ হয়ে যায় — কিনারার ছিদ্রগুলো তখনও কাজ করে। মাটির টব প্লাস্টিকের চেয়ে ভালো, কারণ এর গা দিয়েও পানি বাষ্প হয়ে বেরোয়।

টবের পানি নিষ্কাশনে যা রাখবেন, আর যা রাখবেন না

রাখবেন: ছিদ্রের ওপর ভাঙা টবের একটি টুকরো, নারকেলের ছোবড়া বা এক টুকরো নেট — মাটি আটকাবে, পানি নয়। আর টবের নিচে দুটো ইট, স্ট্যান্ড বা পট-ফিট, যেন নিচ দিয়ে বাতাস চলে।

রাখবেন না: ট্রে বা প্লেট। গরমকালে ওটা পানি ধরে রাখে বলে সুবিধা, বর্ষায় সেটাই টবকে সারাক্ষণ পানিতে দাঁড় করিয়ে রাখে। বর্ষার আগে সব ট্রে সরিয়ে ফেলুন।

আর তলায় ইটের খোয়া বা পাথরের মোটা স্তর দেবেন না। শুনতে যুক্তিসঙ্গত হলেও এটি নিষ্কাশন বাড়ায় না — মোটা খোয়ার ঠিক ওপরে একটা স্থায়ী ভেজা স্তর তৈরি হয় এবং সেটি শিকড়ের আরও কাছে চলে আসে। কেন এমন হয় তা বিস্তারিত আছে গোড়া পচলে গাছ বাঁচানোর ধাপ

আসল নিষ্কাশন হয় মাটির ভেতরে

ছিদ্র যত বড়ই হোক, মাটি জমাট হলে পানি নামবে না। ভালো টবের পানি নিষ্কাশন মানে মাটির কণার ফাঁকে ফাঁকে বাতাস থাকা। এঁটেল মাটি একা ব্যবহার করলে দু-এক মৌসুমেই সেটা ইটের মতো শক্ত হয়ে যায়।

মিশ্রণে ঝরঝরে উপাদান রাখুন — কোকোপিট, পচা গোবর বা কম্পোস্ট, আর কিছুটা মোটা বালু। অনুপাত ও কী কী মেশাবেন তা ধাপে ধাপে দেওয়া আছে ঝুরঝুরে মাটির অনুপাত। প্রতি মৌসুমের শুরুতে ওপরের স্তর আলগা করে দিলে আর নতুন কম্পোস্ট মেশালে মাটি অনেকদিন ঝরঝরে থাকে।

ছাদের ঢাল ভাঙাগড়ার মতো বড় কাজে হাত দেওয়ার আগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফিস থেকে একবার পরামর্শ নিয়ে নিন — খরচের ভুলটা এখানেই সবচেয়ে বেশি হয়।

ছাদের নিজের নিষ্কাশনও দেখুন

টব ঠিক থাকলেও ছাদে পানি দাঁড়ালে লাভ নেই। বৃষ্টির দিনে একবার ছাদে গিয়ে দেখুন কোথায় পানি জমে থাকে — ওই জায়গাগুলোতে টব রাখবেন না, বা রাখলে উঁচু স্ট্যান্ডে রাখুন।

ছাদের পানি বেরোনোর মুখ প্রায়ই ঝরা পাতা, মাটি আর শ্যাওলায় বন্ধ হয়ে যায়। বর্ষার আগে একবার আর মাঝখানে একবার পরিষ্কার করে নিন। ছাদ বাগান শুরু করার সময় জায়গা বাছাই ও পানি নিষ্কাশনের পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত, তা দেখুন ছাদে টব কোথায় বসাবেন

এক নজরে করণীয় — বর্ষার আগে টবের পানি নিষ্কাশন চেকলিস্ট

  1. প্রতিটি টবে এক লিটার পানি ঢেলে নিষ্কাশন পরীক্ষা করুন।
  2. ছিদ্র গুনে দেখুন — কম হলে বাড়িয়ে নিন, বন্ধ থাকলে খুলে দিন।
  3. সব ট্রে ও প্লেট সরিয়ে ফেলুন।
  4. টবগুলো ইট বা স্ট্যান্ডের ওপর তুলুন।
  5. মাটির ওপরের স্তর আলগা করে নতুন কম্পোস্ট মিশিয়ে দিন।
  6. ছাদের পানি বেরোনোর মুখ পরিষ্কার করুন।

বর্ষার আগে এই ছয়টা কাজ একদিনেই হয়ে যায়, আর পুরো মৌসুমে গাছ মরার সবচেয়ে বড় কারণটাই সরে যায়। মৌসুমভিত্তিক পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ে সরকারি পরামর্শ পাবেন কৃষি তথ্য সার্ভিসে

আরও প্রশ্ন

গরমের দিনে ট্রে পানি ধরে রাখে বলে উপকার হয়, কিন্তু বর্ষায় সেটাই টবকে সারাক্ষণ পানিতে দাঁড় করিয়ে রাখে। বর্ষার আগে সব ট্রে সরিয়ে ফেলুন, ঘরের ভেতরের টবে দরকার হলে পানি ঢালার পর ট্রে খালি করে দিন।

Imran Hossain

Imran Hossain

ইমরান হোসেন — রাজশাহীর বাগানি ও বাগান বিশেষজ্ঞ। ছাদ, বারান্দা আর টবে গাছ লাগানোর প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ বাংলায় লেখেন, আর প্রতিটি পরামর্শ মিলিয়ে নেন BARI ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্দেশনার সঙ্গে।

তাঁর সব উত্তর দেখুন →

এই প্রশ্নটি কি কাজে লেগেছে?

আপনার মতামত জানান
Scroll to Top