লাউ গাছে ফল ধরছে না কেন? স্ত্রী ফুল কম হলে
লাউ গাছে প্রথম দিকে যত ফুল আসে প্রায় সবই পুরুষ ফুল — এটা রোগ নয়, গাছের স্বাভাবিক ধরন। মেইন স্টেম ১২–১৪ পাতা হলে ডগা কেটে দিন, দ্বিতীয় শাখার ডগাও ৬–৭ পাতায় কাটুন; তৃতীয় প্রজন্মের শাখায় প্রায় ৮০% স্ত্রী ফুল আসে। এরপর প্রতিদিন সকালে হাত পরাগায়ন করলে ফল ধরা প্রায় নিশ্চিত।

সূচিপত্র
গাছ তরতর করে বাড়ছে, মাচা ভরে গেছে, ফুলও আসছে অজস্র — অথচ লাউ গাছে ফল ধরছে না। ছোট ছোট লাউ একটু বড় হয়েই হলুদ হয়ে ঝরে পড়ছে। এটি বাংলাদেশের ছাদ ও উঠান বাগানের সবচেয়ে সাধারণ অভিযোগ, এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই কারণটা রোগ নয় — ফুলের হিসাব। নিচে কারণগুলো ক্রম অনুযায়ী দেখুন, উপরের দিকেরটাই সবচেয়ে বেশি হয়।
আগে দেখুন — গাছে স্ত্রী ফুল আসছে কি না
লাউ একলিঙ্গ গাছ, অর্থাৎ পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা। চেনার নিয়ম একটাই:
- স্ত্রী ফুল — পাপড়ির ঠিক পেছনে ছোট একটা লাউয়ের আকৃতি থাকে, সেটিই ভবিষ্যতের ফল। বোঁটা ছোট ও মোটা, ভেতরে আঠালো গর্ভমুণ্ড।
- পুরুষ ফুল — লম্বা সরু বোঁটার মাথায় ফোটে, পেছনে কোনো ফল থাকে না, ভেতরে গুঁড়ো পরাগসহ পরাগধানী।
এখন প্রশ্নটা ভাগ হয়ে যায়। স্ত্রী ফুলই যদি না আসে, সমস্যা গাছের শাখার ধরনে। স্ত্রী ফুল আসে কিন্তু ঝরে যায় — সমস্যা পরাগায়নে। (টমেটোতেও ফুল ঝরে, কিন্তু সেখানে কারণটা পুরো আলাদা — টমেটোয় ফুল ঝরার কারণ আবার আলাদা।)
কারণ ১ — গাছ এখনো মেইন স্টেমেই আছে
এটাই সবচেয়ে বেশি হয়, অথচ সবচেয়ে কম জানা। লাউ, কুমড়া, করলা, শসা — লতাজাতীয় সব সবজিতেই মেইন স্টেম ও প্রথম শাখা থেকে আসা প্রায় সব ফুলই পুরুষ ফুল। গাছ যত বড়ই হোক, মেইন লতাটাকে বাড়তে দিলে সারা মৌসুম শুধু পুরুষ ফুলই দেখবেন।
সমাধান হলো গাছকে জোর করে নতুন প্রজন্মের শাখা বের করানো — এটিই ৩জি কাটিং।
৩জি কাটিং — স্ত্রী ফুল ৮০% পর্যন্ত নেওয়ার পদ্ধতি
- প্রথম প্রজন্ম: মেইন স্টেমে ১২–১৪টি পাতা হলে ধারালো ছুরি বা কাঁচি দিয়ে ডগাটা কেটে দিন। গোড়ায় কম্পোস্ট ও নিমের খৈল দিন।
- দ্বিতীয় প্রজন্ম: ৭–১০ দিনের মধ্যে পাশ থেকে নতুন শাখা বেরোবে। গোড়া থেকে প্রথম ৭টি পাতা পর্যন্ত যেসব শাখা বেরোয় সেগুলো ফেলে দিন — নিচের শাখা গাছের শক্তি নিচে টেনে রাখে। ৭ নম্বর পাতার উপরের শাখাগুলো বাড়তে দিন। এই শাখাগুলোতে প্রায় ৪০% স্ত্রী ফুল আসে।
- তৃতীয় প্রজন্ম: এই শাখাগুলো ৬–৭ পাতা হলে আবার ডগা কেটে দিন। এবার যে শাখাগুলো বেরোবে সেগুলোতে প্রায় ৮০% স্ত্রী ফুল আসে।
বাড়তি লাভ — বারবার ডগা কাটলে গোড়া মোটা ও শক্ত হয়, আর গোড়া যত মোটা ফলনও তত বেশি। লাউয়ের অনুমোদিত জাত ও তাদের ফলনের হিসাব দেখতে পারেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর সাইটে।
কারণ ২ — স্ত্রী ফুল আসছে, কিন্তু পরাগায়ন হচ্ছে না
পরাগ না পৌঁছালে স্ত্রী ফুলের পেছনের ছোট লাউটা একটু বেড়ে হলুদ হয়ে ঝরে যায়। ছাদ বা উঁচু বারান্দায় মৌমাছি কম আসে, আর বর্ষার আর্দ্রতায় পরাগবাহক পোকা আরও কমে — তাই হাতেই করতে হয়।
প্রতিদিন সকালে, ফুল সদ্য ফোটা অবস্থায়: একটি তাজা পুরুষ ফুল ছিঁড়ে পাপড়ি সরিয়ে ফেলুন, ভেতরের পরাগসহ অংশটা স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডে হালকা করে ঘষে দিন। একটি পুরুষ ফুল দিয়ে ৬–৭টি স্ত্রী ফুল পরাগায়ন করা যায়। মাচায় প্রতি ১০০টি ফুলের মধ্যে ১০টির মতো পুরুষ ফুল রেখে দিলেই প্রায় ৯৫% স্ত্রী ফুলে ফল ধরে।
কারণ ৩ — সার ভুল দিকে যাচ্ছে
গাছ বিশাল, পাতা ঘন সবুজ, অথচ ফুল কম — এটি অতিরিক্ত নাইট্রোজেনের চেনা লক্ষণ। বেশি জৈব সার বা ইউরিয়া পেলে গাছ পাতা বানায়, ফল নয়।
- জৈব সারের মাত্রা কমিয়ে দিন, ইউরিয়া বন্ধ রাখুন।
- ফুল-ফল ধরার সময় প্রতি গাছে ৫০ গ্রাম টিএসপি + ৫০ গ্রাম এমওপি গোড়া থেকে অন্তত ৬ ইঞ্চি দূরে রিং করে মাটিতে মিশিয়ে দিন, তারপর পানি দিন।
- কখনোই গোড়ায় সরাসরি সার দেবেন না — শিকড় পুড়ে যায়।
সার প্রয়োগের মৌসুমভিত্তিক সূচি কৃষি তথ্য সার্ভিসে দেওয়া আছে, সেটি মিলিয়ে নিতে পারেন।
টবের মাটির অনুপাত ঠিক না থাকলে সারের হিসাবও কাজে আসে না; মিশ্রণের নিয়ম আছে টবের মাটিতে কতটুকু গোবর মেশাবেন।
কারণ ৪ — টব ছোট বা রোদ কম
লাউ বড় গাছ, ছোট টবে ফল ধরে না। কমপক্ষে ১৬–১৮ ইঞ্চি চওড়া ও ৩৫ সেন্টিমিটার গভীর টব লাগে — ৫০ লিটার ড্রামের অর্ধেকই আদর্শ। রোদ লাগবে দিনে অন্তত ৬ ঘণ্টা, আর মাচা বাধ্যতামূলক। ছাদে মাচা ও টব বসানোর হিসাব আছে ছাদে টব আর মাচা বসানোর হিসাব।
লক্ষণ দেখে কারণ বের করুন
| যা দেখছেন | কারণ | করণীয় |
|---|---|---|
| শুধু লম্বা বোঁটার ফুল, পেছনে ফল নেই | সব পুরুষ ফুল, গাছ মেইন স্টেমে | ৩জি কাটিং শুরু করুন |
| ছোট লাউ হলুদ হয়ে ঝরে যাচ্ছে | পরাগায়ন হয়নি | প্রতিদিন সকালে হাত পরাগায়ন |
| পাতা ঘন সবুজ, ফুল কম | অতিরিক্ত নাইট্রোজেন | জৈব সার কমান, টিএসপি ও এমওপি দিন |
| কচি লাউ পচে যাচ্ছে | ফলের মাছি পোকা | আক্রান্ত ফল সরিয়ে নষ্ট করুন, ছাই দিন |
| গাছ খাটো, পাতা ফ্যাকাশে | টব ছোট বা রোদ কম | বড় টবে সরান, রোদে দিন |
এক নজরে করণীয়
প্রথমে ফুল চিনুন — পেছনে ছোট লাউ আছে কি না। না থাকলে ৩জি কাটিং শুরু করুন: ১২–১৪ পাতায় মেইন ডগা কাটুন, প্রথম ৭ পাতার শাখা ফেলে দিন, দ্বিতীয় শাখা ৬–৭ পাতায় আবার কাটুন। স্ত্রী ফুল এলে প্রতিদিন সকালে হাত পরাগায়ন করুন। পাতা বেশি অথচ ফুল কম হলে জৈব সার কমিয়ে টিএসপি ও এমওপি দিন। একটা মৌসুমে এই চারটে ঠিক রাখতে পারলে লাউ না ধরার কারণ আর প্রায় থাকেই না। এলাকাভিত্তিক পরামর্শ দরকার হলে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফিস সবচেয়ে কাছের ভরসা।
আরও প্রশ্ন
বীজ বোনার পর সাধারণত ৫০–৬০ দিনে ফুল আসতে শুরু করে, আর পরাগায়নের ১৫–২০ দিনের মধ্যে লাউ তোলার মতো হয়। ৩জি কাটিং করলে ফুল আসতে কয়েক দিন দেরি হয়, কিন্তু ফলন অনেক বেশি হয়।
না। পরাগায়নের জন্য পুরুষ ফুল লাগবেই। প্রতি ১০০টি ফুলের মধ্যে ১০টির মতো পুরুষ ফুল রেখে দিলে প্রায় সব স্ত্রী ফুলেই ফল ধরে। বাকিগুলো তুলে ফেললে গাছের শক্তি বাঁচে।
না। ধারালো ছুরিতে পরিষ্কার করে কাটলে ৭–১০ দিনেই পাশ থেকে নতুন শাখা বেরোয় এবং গাছ আগের চেয়ে ঝোপালো হয়। কাটার আগে গাছ যেন সুস্থ থাকে আর কাটার পর গোড়ায় কম্পোস্ট দিন।
না, পচে যাওয়া আলাদা সমস্যা। সাধারণত ফলের মাছি পোকা কচি ফলে ডিম পাড়ে, তারপর ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে ফল পচে। আক্রান্ত ফল সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে দূরে নষ্ট করুন, গোড়ায় ছাই দিন।
এই প্রশ্নটি কি কাজে লেগেছে?
কোম্পানি বা বিক্রেতা? পণ্য রিভিউ করাতে পাঠান →


